শনিবার, নভেম্বর ২৬, ২০২২

বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ সবার আগে

ভয়ংকর প্রতারক চক্র: অভিনব ফাঁদে ভুয়া স্বর্ণের বার দিয়ে হাতিয়ে নেয় আসল স্বর্ণ ও টাকা

আজিম নিহাদ:

কক্সবাজার শহরে যেতে রামু বাইপাসে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন এক নারী। সঙ্গে ছিলেন তার ছোট বোন ও শিশু সন্তান। তখন একটি সিএনজি অটোরিক্সা গিয়ে তাকে তুলে নেন। ওই সিএনজি অটোরিক্সায় পেছনে একজন নারী বসা ছিলেন আর সামনে ছিলেন চালকসহ তিনজন। চক্রটি লোভের ফাঁদে ফেলে ভুয়া স্বর্ণের বার দিয়ে তার কাছ থেকে টাকা এবং আসল স্বর্ণের গহনা হাতিয়ে নেয় বলে অভিযোগ করেন ওই নারী। পরিচয় প্রকাশে অনিহায় থাকায় ওই নারীর নাম-পরিচয় গোপন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সিএনজি অটোরিক্সায় উঠার পর চক্রের সদস্যরা তাকে একটি ম্যানিব্যাগ থেকে স্বর্ণের বার ও একটি চিঠি বের করে পড়তে দেন। তখন স্বর্ণের বারটি নামমাত্র মূল্যে কেনার জন্য প্রস্তাব করে চক্রটি। তারা বলেন, এই স্বর্ণের বারটির দাম ৫ লাখ টাকা। তিনি নিতে চাইলে সঙ্গে যা আছে তা দিলেই দিয়ে দিবেন। কিন্তু এক পর্যায়ে বুঝতে পেরে নিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে ধারালো ছুরি ধরে জিম্মি করে সবকিছু হাতিয়ে নেয়।

শুধু তিনি নয়, কক্সবাজারে প্রতিদিন কোন না কোন নারী এমন প্রতারণার শিকার হচ্ছে। ভুয়া স্বর্ণের বার দিয়ে হাতিয়ে নেয় মোটা অংকের টাকা ও আসল স্বর্ণের গহনা। এসব প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ে অনেক নারীর সাংসার জীবনেও নেমে এসেছে ভয়াবহ বিপর্যয়।

প্রতারক ফিরোজ

ভুক্তভোগী বেশ কয়েকজন নারীর সাথে কথা বলার পর বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে এ প্রতিবেদক। কারা ভূয়া স্বর্ণের বার দিয়ে প্রতারণা করে লাখ লাখ হাতিয়ে নিচ্ছে? তাদের নেপথ্যে কে এবং কিভাবে প্রতারক চক্র তাদের প্রতারণার জাল ফেলে দিনের পর দিন প্রতারণা করে যাচ্ছে তার আসল গল্প তুলে আনার চেষ্টা করি।

ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্যে সন্ধান করতে গিয়ে ফিরোজ নামে এই ব্যক্তির দেখা পায় শহরের কলাতলীতে। অনেক চেষ্টার পর তিনি কথা বলেন। রামু থেকে আসার পথে প্রতারণার মাধ্যমে যে নারীর কাছ থেকে স্বর্ণ আর টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন তিনি সেই প্রতারক চক্রের প্রধান। যদিও নিজেকে আড়াল করতে অন্যের উপর দায় চাপেন তিনি। তবে তিনি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন।

ফিরোজ দাবী করেন, তিনি সিএনজি অটোরিক্সার চালকের দায়িত্বপালন করেন। আশরাফ উদ্দিন, হামিদা, নজরুল, তাজ উদ্দিনসহ অন্যরা এসব কাজ করেন। চালকের দায়িত্বপালন করার বিনিময়ে তিনি নিয়মের চেয়ে বেশি ভাড়া পান। সেকারণেই ওই চক্রের সাথে নিয়মিত যান বলে দাবী করেন তিনি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজারে ফিরোজের মত অন্তত ১০টি প্রতারক চক্র রয়েছে, যারা ছড়িয়ে ছিড়িয়ে রয়েছে জেলাজুড়ে। প্রায় দুইমাস চেষ্টার পর কক্সবাজার জেলা কারাগারের সামনে একটি নির্মাণাধীন ভবনে সামনে অবস্থান করার সময় ভয়ংকর এই প্রতারক চক্রের কয়েকজন সদস্যের দেখা পায়। সেখানে ফিরোজকেও দেখা যায়।

ফিরোজসহ অন্যরা এড়িয়ে গেলেও নাছির উদ্দিন নামের এক যুবক স্বর্ণ প্রতারণার বিষয়ে আদ্যোপান্ত খুলে বলেন আমাদের কাছে। তার বাড়ি কক্সবাজার সদরের পিএমখালী তোতকখালী মাঝেরপাড়া এলাকায়।

নাছিরের দাবী জহির নামে একব্যক্তির ফাঁদে পড়ে লোভ সামলাতে না পেরে তিনি ভয়ংকর এই প্রতারক চক্রে জড়িয়ে যান। তার মতো অন্তত শতাধিক প্রতারক রয়েছে। এরমধ্যে কলাতলীর ফিরোজ, চকরিয়ার শামসু পিএমখালীর নজরুল, তার ভাগ্নে মিন্টু ও রুবেল। আলাদা আলাদা গ্রুপ হলেও সবার প্রতারণার ধরণ একই। তবে সকল গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করেন পিএমখালীর জহির। নকল স্বর্ণ বানিয়ে চক্রের সদস্যদের হাতে তুলে দেন তিনি।

প্রতারক চক্রের সদস্য নাছির উদ্দিন

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতারক চক্র নকল স্বর্ণের বার নিয়ে প্রতারণায় ব্যবহার করে সিএনজি অটোরিক্সা। শহরের কলাতলী মোড়, হাসপাতাল সড়কের সামনে, বাজারঘাটা, লিংকরোড়. বাংলাবাজার. রামু, টেকনাফ, কুতুপালং, পেকুয়া, টেকনাফসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করে তারা। যাত্রীর অবস্থা বুঝে নকল স্বর্ণের বার দিয়ে টাকা আর আসল স্বর্ণের গহনা কিভাবে হাতিয়ে নেয় নাছির সেটির বর্ণনা দেন আমাদের কাছে।

নাছিরের দাবী, প্রতারক চক্রের প্রায় সদস্য পড়াশোনা জানে না। কিন্তু তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় প্রতারণার হাতিয়ার বানানো একটি চিঠি পড়তে। চিঠিটি তাদের সকলের মুখস্থ। যাত্রীদের সামনে ওই চিঠিটি পড়েন তারা। সেখানে লেখা থাকে, ‘আমি আসতে না পারার কারণে আমার বড় ছেলেকে দিয়ে ৫ ভরি ওজনের স্বর্ণের বারটি পাঠিয়ে দিলাম। আপনি স্বর্ণের গহনা বানিয়ে রাখবেন।’ তখন ঘটনা এমনভাবে সাজানো হয়, যেনো তারা চিঠি আর স্বর্ণের বার কুড়িয়ে পেয়েছেন।

নাছিরের দাবী, কক্সবাজার শহরের শহীদ স্মরণী মোড়ের পাশে একজন ব্যক্তি পিতলের রড বিক্রি করেন। তার কাছ থেকে প্রতিকেজি পিতলের রড ১ হাজার টাকা দামে কিনে কারিগরের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। প্রতিকেজি পিতলের রডে অন্তত ৪০টি ভূয়া স্বর্ণের বার তৈরী হয়। প্রতিটি বার তৈরী করতে কারিগরকে দিতে হয় ১ হাজার টাকা।

প্রতারক নজরুল

নাছিরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শহরের শহীদ স্মরণী মোড়, গাড়ির মাঠসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় এবং স্ক্র্যাব ব্যবসায়ীদের কাছে খোঁজ করি সেই পিতলের রড ব্যবসায়ীর। কিন্তু আমরা তার দেখা পাইনি। সেখানকার স্ক্র্যাব ব্যবসায়ীরা দাবী করেন, গাড়ির মাঠ পিতলের রড বিক্রি হয় না।

শুরুতে ফিরোজ নামে যে ব্যক্তি নিজেকে সিএনজি অটোরিক্সার চালক দাবী করেন নাছিরের তথ্য অনুযায়ী ফিরোজ প্রতারক চক্রের একটি গ্রুপের প্রধান। প্রতারণার সময় চালকের ভূমিকা পালন করলেও তিনিই ওই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। ফিরোজ স্বর্ণ প্রতারণার পাশাপাশি ইয়াবা কারবারও করেন বলে দাবী প্রতারক চক্রের সদস্য নাছির ও শামসুল আলমের।

প্রতারক চক্রের সদস্য শামসুল আলম

জানা গেছে, প্রতারক চক্রের একেক গ্রুপ কলাতলীর একেকটি কটেজ ও হোটেলে অবস্থান করেন। বিশেষ করে সীপার্ল-১ এবং ২ এ সবচেয়ে বেশি প্রতারক চক্রের সদস্য অবস্থান করে। তারা মাসিক কক্ষ ভাড়া নেন সেখানে। মিশন বাস্তবায়ন করে এসে এসব হোটেলে অবস্থান করেন। ভোর, দুপুর ২ থেকে তিনটা অথবা রাত ১০ টার দিকে তারা বেশি সক্রিয় থাকে।

যে নারীর অভিযোগ পেয়ে প্রথম অনুসন্ধান শুরু হয় তাকে রামু থেকে আসার পথে ফাঁদে ফেলতে ওইদিন ফিরোজের সাথে ছিলেন আশরাফ উদ্দিন, তাজ উদ্দিন ও হামিদা নামে আরো তিনজন। ঘটনার পর তাজ উদ্দিন ও আশরাফ উদ্দিন গা ঢাকা দেয়। কিন্তু কয়েকদিন আগে খবর আসে হামিদা নামে ওই নারী আবারো কক্সবাজার এসেছে। হামিদার বাড়ি চট্টগ্রামে।

অনেক খোঁজাখুজির পর কলাতলীর আল মকসুদ নামে একটি কটেজে তার দেখা মিলে। তবে সেখানে প্রতারক নাছিরকেও দেখা যায়।

অনেক চেষ্টার পর হামিদা কথা বলেন। হামিদার দাবী, ফিরোজ তাদের গ্রুপের প্রধান। তিনি রোহিঙ্গা শিবিরে এনজিওতে চাকরি করতেন। ফিরোজ তাকে লোভের ফাঁদে ফেলে প্রতারক চক্রে জড়িয়েছেন। প্রতারণার প্রথম দিনে তাকে ৫ হাজার টাকা দেন ফিরোজ। প্রতিদিন এভাবে টাকা পেতে পেতে তিনি এক সময় পুরোপুরি চক্রে জড়িয়ে যান। তার দাবী ফিরোজের স্ত্রী, ভাই, খালাতো বোনসহ পরিবারের অন্তত ৫ জন প্রতারক চক্রে জড়িত। কুঁড়িয়ে পাওয়া ভূয়া স্বর্ণের বার যাত্রীদের কাছে আসল প্রমাণ করতে ভূমিকা পালন করে চক্রের নারীরা।

শহরের কয়েকটি সিএনজি অটোরিক্সার স্টেশনে খবর নিয়ে জানা গেছে, নাম্বারবিহীন সিএনজি অটোরিক্সাগুলো প্রতারণার কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে চক্রটি। কক্সবাজারে নিবন্ধন বন্ধ থাকায় কয়েক হাজার অবৈধ সিএনজি অটোরিক্সা মাসোহারা দিয়ে চলে সড়কে। আর এসব অবৈধ সিএনজি ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত চালিয়ে যাচ্ছে নানা অপরাধ কর্মকা-। তাই সিএনজি অটোরিক্সায় উঠার আগে একবার দেখে নেওয়া উচিত আপনি নিরাপদ কিনা?

প্রতারণার শিকার হওয়ার পর অনেকে আইনগত পদক্ষেপে যেতে চায় না। গেলেও অনেক সময় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকার স্বর্ণের গহনা উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তেমন তৎপরতা দেখে না ভুক্তভোগীরা। যার কারণে প্রতারক চক্রটি দিনদিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। সাধারণ নিরীহ মানুষকে এসব প্রতারক চক্রের ফাঁদ থেকে রক্ষা করতে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার দাবী উঠেছে সর্বত্র।

সর্বশেষ খবর

ফ্রি IELTS কোর্স সহ যুক্তরাজ্যে স্কলারশিপ পরামর্শ দিতে কক্সবাজারে হচ্ছে UK EDUCATION MEET 2022

বিশেষ প্রতিবেদকঃ যুক্তরাজ্যের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক শিক্ষা লাভের সুযোগ নিয়ে UK Education Meet 2022 শুরু হতে যাচ্ছে কক্সবাজারে। রোববার বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত দিনব্যাপী...

জেলা নির্মান শ্রমিকদের ফুটবল টূর্নামেন্ট উদ্বোধন 

টিটিএন ডেস্ক : প্রতি বছরের ন্যায় কক্সবাজার জেলা নির্মাণ শ্রমিক উন্নয়ন সমিতি এবারও আয়োজন করেছে আন্তঃ গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্ণামেন্টের। শুক্রবার বেলা ৩ টায় শহরের দক্ষিন রুমালিয়ার...

কক্সবাজারে নবান্ন উৎসব ২৬ নভেম্বর

টিটিএন ডেস্ক: ❝ ঋতুর খাঞ্চা ভরিয়া এল কি ধরণির সওগাত? নবীন ধানের আঘ্রাণে আজি অঘ্রাণ হল মাত ❞ -স্লোগানে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট কক্সবাজার ও জেলা শিল্পকলা একাডেমির...

অঘটনের পর অঘটন ব্রাজিলে- নেইমারের পর এবার কে?

স্পোর্টস ডেস্ক: গোড়ালির চোটে কাতার বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে ছিটকে গেলেন তারকা ব্রাজিল ফরোয়ার্ড নেইমার ও দানিলো লুইজ দা সিলভা। ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে রক্ষণভাগের খেলোয়াড়...