সোমবার, জানুয়ারি ৩০, ২০২৩

বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ সবার আগে

পুড়ে গেছে শূন্যরেখার রোহিঙ্গা শিবির: তুমব্রুতে ত্রিপলে নতুন আশ্রয়!

মোহাম্মদ নোমান, তুমব্রু থেকে ফিরে:

দুই হাজার সতের সালের আগস্টে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের চালানো অভিযানের সময় আগুনে ঘরবাড়ি হারিয়ে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম-তুমব্র সীমান্তে শূন্যরেখা আশ্রয় নিয়েছিলাম। পাচঁ বছর ধরে সেখানেই জীবন যাপন কাটছিল। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার গোলাগুলি-আগুনের লেলিহান শিখায় শেষ আশ্রয়ও নি:স্ব হয়ে গেছে। এখন ঘরবাড়ি হারিয়ে সেই পাচঁ বছর পুরনো, আগের জায়গায় এসে পৌছেছেন।

শুক্রবার বিকেলে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাশে খালি জায়গায় ত্রিপলের ভাঙা বাসায় এসব কথাগুলো বলেছিলেন ষাট বছরের আবদুল মালেক।

তিনি জানান, ‘পাচঁ বছর ধরে আমরা শূন্যরেখায় (জিরু পয়েন্টে) ছিলাম। ‘আইসিআরসি’ আমাদের সুযোগ-সুবিধা দিতেন সরকারের পক্ষ হয়ে। কিন্তু সমস্যার কারনে আমরা বর্তমানে এখানে (এপারে তুমব্র বাজারে) বাসা বেঁধে থাকছি। আমাদের আগুন লাগিয়ে দেয়। তখন আমরা মিয়ানমারে ঢুকে যায়। এক রাত থাকার পর আবার বার্মা (মিয়ানমার) থেকে একূলে পার করে দেয়, সেদেশের সরকার। এখন আমরা কোথায় যাবো? এখানে থাকার ব্যবস্থা নেই, নেই খাবার, টয়লেটও। এতে নারী-শিশুদের নিয়ে খুব সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। ’

মালেক জানান, আগুনে শীতের কাপড়সহ সব পুড়ে গেছে, এখন পর্যন্ত কোন খাবারও জোগাড় করতে পারেননি। ঠান্ডায় শিশুরা কাবু হয়ে যাচ্ছে। অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। ছোট্ট একটি ভাঙা ত্রিপলের ছাউনিতে বাচ্চাদের নিয়ে তিন পরিবারের ১৯ জন মানুষ গাদাগাদি করে এক জায়গায় থাকছি।
আজকেও সীমান্তে গোলাগুলির শব্দ পাওয়ায় গেছে এবং অবশিষ্ট ঘরবাড়িগুলোও আগুনে পুড়ে গেছে বলে দাবী করেন তিনি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শূন্যরেখার কাছাকাছি তুমব্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ তার আশপাশে কয়েক’শ রোহিঙ্গা পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। অনেকে ঠাঁই নিতে ত্রিপল নিয়ে পরিবারের সদস্যরা মিলেমিশে গাছ-বাঁশ নিয়ে বাসা তৈরী করছিলেন। আবার অনেকে আশ্রয় নিতে জায়গায় খোঁজতে এদিক-ওদিক ছুটছে। এছাড়া বাজারে অন্যদিনের তুলনায় রোহিঙ্গাদের আনাগুনা ছিল চোখে পরার মতো।

শূন্যরেখা শিবিরে আগুনে ঘর হারিয়ে পরিবার নিয়ে তুমব্র বাজারে আশ্রয় খোঁজতে আসা আবু নাসের জানান, ‘শূন্যরেখা রোহিঙ্গা শিবিরে বসবাসকারিদের মধ্য আমিও ছিলাম। কিন্তু আগুন দিয়ে আমাদের ঘরবাড়িগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা নিরহ মানুষ, কোন পক্ষের না। সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, গায়ের পরনের জামা ছাড়া কিছু বের করতে পারেনি। আমার স্ত্রীও অসুস্থত, পরিবার নিয়ে আশ্রয় নিতে একটি জায়গায় খোঁজছি। এর আগের দিন স্থানীয় এক হিন্দু পরিবারের কাছে একদিন আশ্রয় নিয়েছিলাম।’

তুমব্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেয় আব্দুল করিম (৯০) ও আমেনা খাতুন (৭০) দম্পতি। তাঁরা জানালেন, ‘মৃত্যুর কাছাকাছি সময়ে এসে পৌছেছি। এর মাঝেও কোথাও স্থায়ীভাবে ঠাঁই হচ্ছে না। ২০১৭ সালে আগস্টে ঘরবাড়ি হারিয়ে শূন্যরেখায় ঠাঁই হয়েছিল। সেখানে কোনভাবে পাচঁ বছর বাচাঁর যুদ্ধ চলছিল। এখন সেটিও ছেড়ে দিতে বোধ্য হয়েছি। এখানে স্কুলের বারান্দার কোনে এক জায়গায় দুজন একসাথে পরে আছি। বেঁচে থাকার যুদ্ধ করছি। শীতের মধ্য খুব কষ্ট হয়। ঠান্ডায় ঘুমাতে না পেরে রাতে বসে থাকতে হয়। তার উপরে নেই খাবারের ব্যবস্থা। এবার বুঝতে পারে কি অবস্থায় আছি?’

সীমান্তের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তুমব্র সীমান্তে কোনারপাড়া শূন্যরেখা রোহিঙ্গা শিবির এলাকায় মিয়ানমারের দুই সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (আরসা) ও রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) মধ্যে শুক্রবার সকালেও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া সীমান্তের আগুনের ধোঁয়া দেখা গেছে। এর আগে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় শূন্যরেখার প্রায় ৫’শ রোহিঙ্গাদের বসতঘর পুড়ে যায়। ফলে তুমব্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ আশপাশে বেশকিছু রোহিঙ্গা আশ্রয় নিতে শুরু করে।

তুমব্র বাজারের দোকানদার নির্মল ধর জানান, ‘গত বুধবার থেকে সীমান্তে থেমে গোলগুলি-আগুন খেলা চলছে। আজকে ভোরেও গোলাগুলি-আগুনের ধোঁয়া দেখা গেছে। শূন্যরেখার অনেক রোহিঙ্গা তুমব্র সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয়সহ তার আশপাশে এখন নতুন করে ত্রিপলের ছাউনি দিয়ে ঘরবাড়ি বানাচ্ছে রোহিঙ্গারা। যার কারনে স্কুলের পাঠদান বন্ধ রয়েছে। গোলাগুলি-আগুনের ঘটনায় যেসব রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ঢুকেছিল, তারাও এপারে আশ্রয় খোঁজছে।’

জানতে চাইলে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রোমেন শর্মা বলেন, ‘তুমব্রু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ তার আশপাশে কিছু রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে বলে শুনেছি। যাতে রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে পরতে না পারে, সেজন্য একাধিক আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কাজ করছে। তবে কতজন রোহিঙ্গা এখানে আশ্রয় নিয়েছে তা জানার চেষ্টা চলছে। সীমান্তের সবাই সর্তক অবস্থানে রয়েছে, পরিস্থিতি শান্ত আছে।’

এদিকে তুমব্রতে শূন্যরেখায় স্থাপিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২০১৭ সালের পর থেকে চার হাজার ২৮০ রোহিঙ্গা বসবাস করছিল।

প্রসঙ্গত গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে তুমব্র সীমান্তে মিয়ানমার অংশে সেদেশের সেনাবাহিনী এবং স্বাধীনতাকামী বিদ্রোহী আরাকান আর্মির মধ্যে প্রায় দুই সপ্তাহব্যাপী সংঘর্ষ চলে। ওই সংঘর্ষে মিয়ানমার অংশ থেকে মর্টার শেল তুমব্র সীমান্তে বাংলাদেশ ভূখন্ডে এসে পড়ে। সেসময় বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমার রাষ্ট্রদূতকে ডেকে কয়েক দফা প্রতিবাদ জানায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ভূখন্ডে মর্টারশেল পড়ায় মিয়ানমারের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করা হয়। তারা জানায়, ভুলবশত মর্টারশেল বাংলাদেশ ভূখন্ডে এসে পড়েছিল।

সর্বশেষ খবর

রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণে রাখাটাই একটা চ্যালেঞ্জ : র‌্যাব মহাপরিচালক

  টিটিএন ডেস্ক : র‌্যাবের মহাপরিচালক এম খুরশীদ হোসেন বলেছেন, পাহাড়ে বিশাল একটা রোহিঙ্গা জনসংখ্যা রয়েছে। তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখাটাই একটা চ্যালেঞ্জ। তারা বুঝতে পেরেছে এ দেশের...

নির্মাতা কাওসার চৌধুরী পাচ্ছেন জাতীয় চলচিত্র পুরস্কার

নিজস্ব প্রতিবেদক: কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ির কৃতি সন্তান বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা ও অভিনেতা কাওসার চৌধুরী জাতীয় চলচিত্র পুরুষ্কার ২০২১ এর জন্য মনোনীত হয়েছেন। তিনিই প্রথম ব্যাক্তি...

পাঠ্যবই নিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে: শিক্ষামন্ত্রী

টিটিএন ডেস্ক: শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, নতুন পাঠ্যক্রমে কোনো ভুলভ্রান্তি থাকলে তা সংশোধন করা হবে। তবে এ নিয়ে অপপ্রচার চলছে। আওয়ামী লীগ সরকার কখনো ইসলামের...

কক্সবাজারের ই”য়াবার মামলায় ৮ মিয়ানমার নাগরিকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

আব্দুর রশিদ মানিক: দুই লক্ষ ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় আট রোহিঙ্গাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করেছে কক্সবাজারের অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত। একইসাথে দন্ডিতদের প্রত্যেককে ১ লক্ষ টাকা...