বৃহস্পতিবার, জুন ৩০, ২০২২

টাকার বিনিময়ে জালিয়াতি করে হচ্ছেন ভোটার

শিপ্ত বড়ুয়া ও তানভীর শিপু, রামু থেকে ফিরে

বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের জেলা কক্সবাজার। মায়ানমার সীমান্তের সাথে লাগোয়া এই জেলার তিন উপজেলা টেকনাফ-উখিয়া ও রামু। বিভিন্ন দফায় বাংলাদেশে আসা বাস্তুচ্যুত মায়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিশাল একটি অংশ বসবাস করছে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার শরণার্থী শিবিরে। দীর্ঘদিন ধরেই গুঞ্জন আছে অবৈধ উপায়ে স্থানীয় কিছু ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার-চেয়ারম্যানদের সহযোগিতায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই হয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশের নাগরিক ও পেয়ে যাচ্ছেন জন্মসনদ।

সম্প্রতি ভোটার হালনাগাদ সপ্তাহ শুরু হলে রামু উপজেলার চাকমারকুল ইউনিয়নে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে একাধিক ভোটার করানোর অভিযোগ উঠেছে এই ইউনিয়নের ৭ নাম্বার ওয়ার্ডের মেম্বার নুরুল আমিন ও একই ওয়ার্ডের গ্রাম-পুলিশ রিদুয়ানের বিরুদ্ধে।

সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী টিটিএন এর অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর নানান তথ্য। চাকমারকুল ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডে মামার বাড়িতে বসবাস করেন শামিনা আক্তার শাহীন। তার মা সেলিনা বেগম কথা বলতে পারেন না(বোবা)। শাহীন শিশুকাল থেকেই দেখেননি তার পিতা। তাদের নিজস্ব কোন ভিটে-মাটিও নেই। মামা-নানুর মুখে শুনেছেন শাহীনের মা গর্ভাবস্থায় তার বাবা তার মাকে ছেড়ে চলে যান, এরপরে আর কোন খোঁজ মেলেনি। লোকমুখে শোনেছেন তার বাবার আসল বাড়ি টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নে। স্থানীয়দের মধ্যে কেউ কেউ দাবী করছেন শাহীনের বাবা ছিলো রোহিঙ্গা।

এবারের ভোটার তালিকা হালনাগাদ সপ্তাহ শুরু হলে শামিনা আক্তার শাহীন বাংলাদেশের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেন স্থানীয় মেম্বারের মাধ্যমে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে শামিনা আক্তার শাহীন ভোটার হওয়ার জন্য যেসব কাগজপত্র দাখিল করেছেন তার অধিকাংশ জাল-জালিয়াতি করে তৈরি করা। এবং এসব কাগজপত্র তৈরিতে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে স্থানীয় গ্রামপুলিশ রিদুয়ান ও মেম্বার নুরুল আমিনের নাম উঠে এসেছে।

শামিনা আক্তার শাহীনের সাথে কথা হয় টিটিএন এর। তিনি টিটিএনকে বলেন, “আমি রোহিঙ্গা নয়। আমার অনলাইন জন্মনিবন্ধন আছে এবং আমি স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণীতে লেখাপড়া করি।” শাহীনের পিতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি মায়ের পেটে থাকা অবস্থাতেই নাকি আমার বাবা আমার মাকে ছেড়ে চলে যান আর সে থেকে কোন খোঁজ মেলেনি আমার বাবার। তাছাড়া সেসময় নাকি তার কোন জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র ছিলোনা।”

এদিকে, শামিনা আক্তার অষ্টম শ্রেণীতে পড়েন বললেও ভোটার নিবন্ধন ফরমে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা দেখানো হয়েছে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত।

সূত্র বলছে শামিমা আক্তার শাহীনের জন্মনিবন্ধন ভুল তথ্য দিয়ে করা এবং জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে জাতীয়তা সনদ, যাচাই-বাচাই প্রতিবেদন, প্রত্যয়ন পত্র তৈরি করা। সে প্রাপ্ত সূত্র ধরে শামিম আক্তারের জন্মনিবন্ধনের একটি কপি নিয়ে যাচাই করতে চাকমারকুল ইউনিয়ন পরিষদের সচিব স্বরূপা পালের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি এই জন্মনিবন্ধনের নাম্বার ধরে অনলাইন ডাটাবেজ থেকে যে তথ্য দিলেন তা দেখে চমকে উঠতে হলো।

শাহীনের জন্মনিবন্ধন করা হয়েছে এবছরের পহেলা জানুয়ারি ও নোয়াখালী জেলার শরীফপুর ইউনিয়ন থেকে। কিন্তু শাহীন নাগরিক হওয়ার জন্য যে জন্মনিবন্ধন সংযুক্ত করেছেন সেটি চাকমারকুল ইউনিয়ন পরিষদের নামে এবং সেই জন্মনিবন্ধন ইস্যুর তারিখ দেওয়া আছে ২০১৫ সালের ২২শে জানুয়ারি। তাছাড়া তার এই জন্মনিবন্ধনে নিবন্ধক হিসেবে তৎকালীন চাকমারকুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুফিদুল আলমের স্বাক্ষর দেখা গেছে। বর্তমান চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম সিকদার ও ৭ং ওয়ার্ডের মেম্বার নুরুল আমিনের সিল ও স্বাক্ষর আছে এই জন্মনিবন্ধনে। এই জন্মনিবন্ধন প্রস্তুতকারক হিসেবে সচিব স্বরূপা পালের স্বাক্ষরও দেখা গেছে।

নোয়াখালীর শরীফপুর ইউনিয়ন থেকে জন্মনিবন্ধন করে চাকমারকুল ইউনিয়ন পরিষদের নামে জন্মনিবন্ধন কিভাবে পেলেন শামিনা আক্তার শাহীন এমন প্রশ্নের জবাবে পরিষদের সচিব স্বরূপা পাল টিটিএনকে বলেন, “এটা কখনোই সম্ভব না, অনলাইনে যাচাই করে দেখলাম এই জন্মনিবন্ধন এবছরের পহেলা জানুয়ারি শরীফপুর ইউনিয়ন থেকে করা হয়েছে। আমি এই জন্মনিবন্ধন দিই নি। কেউ আমার স্বাক্ষর নকল করে এই জন্মনিবন্ধন প্রস্তুত করেছে।”

একই বক্তব্য বর্তমান চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম সিকদারের। তিনি বলেন, “মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ৭নং ওয়ার্ডের মেম্বার নুরুল আমিন আমার স্বাক্ষর ও সিল নকল করে ঐ মেয়ের সকল নকল কাগজপত্র তৈরি করেছেন ভোটার করানোর জন্য। আমি এবিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অভিযোগ জানাবো।”

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ৭নং ওয়ার্ডের চৌকিদার রিদুয়ান বলেন, “এসব বিষয়ে আমি কিছু জানি না। মেম্বার-চেয়ারম্যানের জোরজবরদস্তির কারণে আমি স্বাক্ষর করেছি। যা জানার মেম্বারের কাছ থেকে জিজ্ঞেস করেন।”

এসব জালিয়াতিতে প্রধান অভিযুক্ত ৭নং ওয়ার্ডের মেম্বার নুরুল আমিন টিটিএনকে বলেন, “আমি কোন স্বাক্ষর জালিয়াতি করিনি। চেয়ারম্যান নিজেই এসব কাগজপত্রে স্বাক্ষর করেছেন। অন্য কাগজপত্রে করা স্বাক্ষরের সাথে এই স্বাক্ষর মিলিয়ে দেখলে আসল সত্য বের হওয়ার কথাও জানান তিনি।”

টিটিএন এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শামিনা আক্তার শাওন ভোটার হওয়ার জন্য যে কাগজপত্র জমা দিয়েছেন তারমধ্যে নোয়াখালীর শরীফপুর ইউনিয়ন থেকে জন্মনিবন্ধন নিবন্ধিত হলেও জন্মসনদ দেওয়া হয়েছে চাকমারকুল ইউনিয়নের নামে এবং চাকমারকুলের চেয়ারম্যান, মেম্বার ও সচিবের স্বাক্ষর দেখা গেছে এই জন্মসনদে। পাশাপাশি ভোটার নিবন্ধন ফরমে তিনি তৃতীয় শ্রেণী পাশের তথ্য দিলেও আমাদের কাছে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে বলে জানান শাহীন।

শুধু এখানেই শেষ নয়, এই ইউনিয়নে অধিকাংশ রোহিঙ্গা নামে-বেনামে ভোটার হয়েছে এরও আগে এমনটাই বলছে গোপন সূত্র। বর্তমানে এই ইউনিয়নের বিভিন্ন জায়গায় খাস ও সরকারি জমিতে বসবাস করছেন অনেক রোহিঙ্গা।

সঠিক যাচাই-বাচাই শেষে ভোটার নিবন্ধন জারী থাকবে এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

আরও খবর

Stay Connected

0FansLike
3,374FollowersFollow
19,800SubscribersSubscribe
Adspot_img

সর্বশেষ সংবাদ