শুক্রবার, ডিসেম্বর ৩, ২০২১

কসউবি’র শেষ দিনটি ছিলো বেদনার রঙে রঙ্গিন

শাহরিয়ার আমান সামির:

বিদায় বেলায় বুঝতে পারছি কতটা ভালোবাসি কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় কে!
বিদায়ের বেদনা কতটুকু তা আমরা এখন বুঝতে পারছি।। বিদায়ে এত বেদনা কেন? কেন এত কান্না, এত কষ্ট? এত হাহাকার? কেন? বিদায় মানে কি তবে ছেড়ে যাওয়া? কারো চোখের পানিতে বিদায়ের পথটি ভিজে কর্দমাক্ত হয়ে উঠুক, তা যে চাই না। সে জন্যই কি আকুতি- ‘মোছ আঁখি, দুয়ার খোল, দাও বিদায়।’ সে জন্যই কি চোখে জল আর মুখে হাসি নিয়ে বলি- ‘শুভ বিদায়’?

২১শে অক্টোবর, ২০২১, ভোর থেকেই গোমড়ামুখে আকাশ, যেনো আকাশেও মন খারাপ সাথে মুষলধারে বৃষ্টি। আজকের সকালটি প্রতিদিনের মতো নয়।আজকের পর থেকে হয়তো ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্কুলে যাওয়া কোনো তাড়া থাকবে না। খুব ইচ্ছে হবে স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের সাথে ক্লাস করার! কিন্তু সেই ইচ্ছেটা যে ইচ্ছে হয়েই রয়ে যাবে তা ভাবতেই মনের মধ্যে শিহরণ জাগে। আগে ভাবতাম কখন যে স্কুল জীবন শেষ করে কলেজে যাবো! এখন সময় এসেছে। কিন্তু বিদায়বেলায় এসে মনে চাইছে আর কটা দিন যদি স্কুলে কাটাতে পারতাম! নিজের অজান্তেই চোখের কোণে জল এসে বলছে, যেতে তো চাই না তবুও কেন তাড়িয়ে দিচ্ছো আজ এভাবে! হতেই পারে নিজের অজান্তেই স্কুল এবং স্কুলের সবাইকে অনেক অনেক ভালোবেসে ফেলেছি, আজকের দিনটি স্মৃতির পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে আজীবন। আজকের দিনটি যেমনটা আনন্দের তার চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। কারণ আজকে ছিল স্কুল জীবনের শেষ কার্যদিবস।

স্কুলে এসে মামার (স্কুল অফিস সহকারী) সাথে কুশল বিনিময় করা, প্রত্যহিক সমাবেশ ফাঁকি দেয়া, বেকবেঞ্চে বসা, পড়া না পারলে স্যারের বকা, একজন আরেকজনের হোমওয়ার্ক নকল করা, একজনে দোষ করে আরেকজনকে দোষারোপ করা, একজনের টিফিন আরেকজনে খেয়ে ফেলা, কলম না আনার বাহানায় স্যার ও বন্ধুদের থেকে কলম নিয়ে আর ফেরত না দেওয়া,মোস্তফা ভাইয়ের ক্যান্টিন। আরও কত কী!

কসউবি’র ছাত্রদের হাইস্কুল জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে গোলদিঘির পাড়। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে গোলদিঘির পাড়ে বন্ধুদের আড্ডা দেয়ার সময়টুকু এখন বারবার মনে পড়বে। শত চেষ্টা করলেও আর ফিরে পাব না স্কুলজীবনের সেই মুহূর্তগুলো। আজ থেকে সবকিছুই স্মৃতিমাত্র। যদিও সময়টা ছিল স্কুল পেরিয়ে কলেজে যাওয়ার কিন্তু বিশ্বব্যাপী অদৃশ্য অনুজীব আমাদের স্কুলজীবনকে আরও প্রসারিত করেছিলো।

২১শে অক্টোবর ছিল আমাদের বিদায় দিবস। সেদিন ছাত্র ও শিক্ষকদের সহায়তায় বিদায়কালীন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলাম। আনন্দ ও বেদনার দিনটির শুরুতেই বৃষ্টির বাঁধা। প্রকৃতিও যে চায় না আমরা প্রিয় বিদ্যালয় ছেড়ে চলে যায়! প্রথমে বিদায় কেমন হবে তা উপলব্ধি করতে পারিনি। তাই অন্য দিনের মতোই হাসিখুশি ছিলাম। তবে শিক্ষক ও ছাত্ররা যখন মলিন মুখে মঞ্চে উঠলেন হঠাৎ পরিবেশ গম্ভীর হয়ে গেল। এমন গম্ভীর পরিবেশ দেখে বুকের ভেতরটা কেমন জানি মোচড়ে উঠল। পাঁচ বছরের আনন্দময় জীবনের বিদায় ঘণ্টা শুনে মন স্তব্ধ হয়ে গেল। চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল একের পর এক স্মৃতিময় স্বর্ণালি দিনের ছবি। সাথে বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করলেন । সবাই আমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করে জীবনকে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা ও পরীক্ষার কিছু উপদেশ দিলেন।

আমাদের বিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষক সকলের খুব পরিচিত জন জনাব শাহজাহান কুতুবী স্যারকে আমরা খুবই ভয় পেতাম। স্যারের কাছাকাছি গেলেই আমাদের হৃদস্পন্দন বেড়ে যেত। আর সামনে পড়লে তো মুখ দিয়ে কথাই বের হতো না। স্যার আমাদের যেমন শাসন করতেন তেমনি আদরও করতেন। মিস করবো স্যারের সেই ভয়ানক চোখের চাহনি। কিন্তু সেদিন স্যারের ব্যক্ত করা অনুভূতি যেন আবেগআপ্লুত সকল শিক্ষার্থীদের।

তিনি আমাদেরকে আত্মশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার তাগিদ দিলেন এবং সত্যিকারের মানুষ হয়ে মানুষের দাঁড়ানোর আহ্বান জানালেন। এর পর প্রোগ্রামের শেষপ্রান্তে এসে উপদেশমূলক বক্তব্যে প্রধান শিক্ষক রাম মোহন সেন স্যার আমাদের স্কুলজীবন ও কলেজ জীবনের পার্থক্য সম্পর্কে বললেন এবং দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্বন্ধে সচেতন থাকতে উপদেশ দিলেন। তারপর সবাই মিলে দুপুরের একসাথে শেষ আহারের আয়োজন। যতই বিদায়ের সময় ঘনিয়ে আসছিল ততই সবার মুখটা কেমন জানি মলিন হয়ে আসছিল। প্রিয় প্রাঙ্গন, প্রিয় শিক্ষকগণ এবং প্রিয় বন্ধুদের বিদায় জানানোর ঘণ্টা বেজে গেল। এখন তো চাইলেও আর থাকা যাবে না! চলে তো যেতেই হবে! প্রিয় অনুজ ও সম্মাণীয় শিক্ষকদের মনের ভাষায় প্রকাশ পায় যেমনটি, কবি রবি ঠাকুরের ভাষায়-

যেতে নাহি দেব হায়
তবুও যেতে দিব হায়
তবুও যেতে দিতে হয়।
ছন্দে আন্দোলিত হচ্ছে হৃদয় যেভাবে –
“বিদায় বেলায় বিরহ ব্যথায় আঁখি ওঠে চলচলি
যাবার বেলায় যারা অপরে কাঁদায় তাদের মানুষ বলি।”
প্রিয় বন্ধুদের বলি, হৃদয় আজ চৌঁচির, মনের বোবা কান্না ডুকরে ডুকরে ওঠছে। জীবনের ছয়টি বছর যে পাঠশালায় হেঁসে -খেলে, বড় ভাই ও শিক্ষক -শিক্ষিকাদের নিখাঁদ আদরের বেড়া জালে আবদ্ধ ছিলাম। আজ! আজ!! আজ?

তাই সহপাঠী বন্ধুদের স্মরণ করাতে চাই যে, ছন্দের ব্যাকুলতায় হৃদয়ের বিচলতায় যেমনি ভাবে-
হাঁসি দিয়ে যদি লুকালে তোদের সারা জীবনের বেদনা
আজি তবুও তোরা হেঁসে যাও বিদায়ের দিনে আর কেঁদোনা।
চলে যাবে তুমি কিম্বা আমি
পড়ে থাকবে স্কুল, মাঠ, গাছপালা সব ।
ওদের তো যাওয়ার কোন জায়গা নেই !
যদি কখনো দেখতে আসো , স্মৃতিগুলো তাড়া করবে,
বলবে, ‘সব ঝুট হ্যাঁয়, তফাৎ যাও’।

এভাবেই কেটে গেল দিনটা। বিদায় নিলাম স্কুল থেকে। বিদ্যালয়ের শেষ দিনটি খুব স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সেদিন বিদায়ের সঙ্গে কৈশোর, আড্ডা আর ঝা চকচকে আনন্দ হারিয়ে ফেলেছি। তবুও সামনে এগুতে হবে। মানুষ হতে হবে। মানুষ হওয়ার পথে এখনো বহুপথ পাড়ি দিতে হবে। স্কুলের শেষদিনের স্মৃতিচারণ মুলক কিছু কথা। কথা গুলো আমার স্কুলের এসএসসি ২০২১ ব্যাচের বন্ধুদের উৎসর্গ করলাম৷

শাহরিয়ার আমান সামির
শিক্ষার্থী, এসএসসি ব্যাচ-২০২১,
কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়।

আরও খবর

Stay Connected

0FansLike
3,044FollowersFollow
18,800SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ সংবাদ