বৃহস্পতিবার, জুন ৩০, ২০২২

কক্সবাজারে বাড়ছে মানুষ আর হাতির সংঘাতঃ দুই বছরে ৬ হাতির মৃত্যু- হাতির আক্রমনে একইসময়ে মারা গেছে ২জন

শিপ্ত বড়ুয়া:

০৬ জুন, কক্সবাজারের রামু-মরিচ্যা আরাকান সড়কের ঢালার মুখ এলাকার প্রধান সড়কে নেমে পড়ে একটি বয়স্ক বন্যহাতি রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে, এরকম প্রায় সময় লোকায়লয়ে নেমে বসে হাতির পাল।

এশিয়ান হাতির আবাসস্থলের মধ্যে কক্সবাজারের বিভিন্ন পাহাড় ও বন অন্যতম। তবে আগের চেয়েও হাতির সংখ্যা আশংকাজনক হারে কমেছে বলে দাবী স্থানীয় পরিবেশবাদীদের। সেই সাথে অস্তিত্বের সংগ্রামে মুখোমুখি হাতি ও মানুষ।

সূত্র বলছে, কক্সবাজারে গত দুই বছরে মানুষ-হাতির সংঘাত ও বিভিন্ন কারণে কক্সবাজারে গেলো দুই বছরে প্রায় ৬টি বন্য হাতির অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর জানা যায়। হাতির প্রধান আবাসস্থল ও প্রধান করিডোরগুলো বন্ধ করে হাতির অভয়ারণ্যে স্থাপনা নির্মাণ, টেকনাফ ও উখিয়ায় রোহিঙ্গা শরর্ণার্থী শিবির ও নির্বিচারে সংরক্ষিত বনভূমি ধ্বংসের ফলে এ অবস্থা হয়েছে বলে দাবি পরিবেশবাদীদের সংগঠনের নেতাদের।

গ্রীণ এনভায়রনমেন্ট মুভমেন্ট কক্সবাজার জেলার সাধারণ সম্পাদক কায়সার মাহমুদ বলেন, কক্সবাজারে হাতি পারাপারের মোট করিডোর আছে আটটি, তার মধ্যে এসব করিডোরের কিছু জায়গায় স্থাপনা, রোহিঙ্গা ক্যাম্প হওয়ার কারণে হাতির প্রজনন ও খাদ্য সংগ্রহকালীন সময়ে নানান সংকট দেখা দিচ্ছে যার কারণে লোকালয়ে হানা দেয় হাতির দল আর তখনই মানুষের সাথে সংঘাত হয়,যা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। সংঘাত কমাতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে নানামুখী উদ্যেগ নেওয়া জরুরী হয়ে পড়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব ন্যাচার (আইইউসিএন) এর এক গবেষণায় দেখা গেছে মহাবিপন্ন এশিয়ান হাতির দুই-তৃতীয়াংশের বসবাস কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে। ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে কক্সবাজার উত্তর ও দক্ষিণ বনবিভাগে ১১৭টি হাতির উপস্থিতি পাওয়া গেছে। কিন্তু গেলো চার বছরের ব্যবধানে কক্সবাজারে আশংকাজনক হারে মানুষের সাথে সংঘাতে নিহত হয়েছে বহু বন্যহাতি ও মানুষ। প্রকাশিত গবেষণায় আরও বলা হয়েছে হাতির আবাসস্থলে মানুষের অনুপ্রবেশ ও বন উজাড়ের কারণে খাদ্য সংকটের কারণে লোকালয়মুখী হচ্ছে বন্যহাতি।

সূত্র বলছে, ২০২০ সালের ৬ নভেম্বর চকরিয়ার খুটাখালী বনাঞ্চলে গুলি করে হত্যা করা হয় একটি বাচ্চা হাতিকে। একই বছরের ১৬ নভেম্বর রামুর জোয়ারিয়ানালা বনাঞ্চলে গুলিবিদ্ধ হয়ে ৩০ বছর বয়সী একটি স্ত্রী হাতি মারা যায়। একই বছরের ১৭ই নভেম্বর রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়িতে বৈদ্যুতিক শক ও গুলি করে হত্যা করা হয় আরও একটি হাতিকে।

এর পরের বছর ২০২১ সালের ২১ নভেম্বর ঈদগাঁও উপজেলার ইসলামাবাদ ইউনিয়নের গজালিয়ার সাতঘরিয়াপাড়া সংলগ্ন ক্লিব্বা এলাকায় পাওয়া যায় একটি হাতির মরদেহ। একই বছরের ১ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামুর খুনিয়াপালং ইউনিয়নে লোকালয়ে চলে আসা একটি মা হাতিকে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়া এবছরের ১ জানুয়ারী কক্সবাজারের টেকনাফে বন্য হাতির একটি মৃত শাবক উদ্ধার করেছে বন বিভাগ।

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ক্যান্টে রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব নিয়ে অধ্যায়নরত মনস্তত্ত্ববিদ লিটন বড়ুয়া বলেন, বিভিন্ন কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় জনসাধারণ ও বন্যপ্রাণীদের যেহেতু বিপরীতমুখী সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে সেটা ভবিষ্যতে কতটা ক্ষতিক্ষর হতে পারে তা কল্পনার বাইরে। আমরা ভুলে গেলে চলবে না যে পরিবেশ, প্রানী ও মানুষের জীবন সবই একই সুঁতোয় গাঁথা। কারণ, বাস্তুসংস্থান প্রক্রিয়াকে যথাযথ সক্রিয় রাখতে হলে মানুষ-প্রাণী ও পরিবেশের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরী।

শুধু হাতিই নয়, মানুষ-হাতি সংঘর্ষে অনেক সময় মানুষও মারা পড়ছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের বছরের ৭ই ফেব্রুয়ারী কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় দলছুট এক বন্য হাতিকে বনে ফেরাতে গিয়ে হাতির পায়ের নিচে পড়ে পিষ্ট হয়ে মারা যান এক ফরেস্ট ভিলেজার।২০২২ সালের ৬ মার্চ কক্সবাজারের রামু গর্জনিয়ায় বন্য হাতির আক্রমণে আরেক স্থানীয় নিহত হয়েছেন।
কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগ ঈদগড়ে হাতির অভয়ারন্য ঘোষনা করলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। তাই হাতি আর মানুষ উভয়েরই অস্তিত্ব রক্ষা হয় এমন পদক্ষেপ নেয়া জরুরি, বলছেন বিশ্লেষকেরা।

আরও খবর

Stay Connected

0FansLike
3,374FollowersFollow
19,800SubscribersSubscribe
Adspot_img

সর্বশেষ সংবাদ