শুক্রবার, মে ২০, ২০২২

একমাত্র প্রবাল দ্বীপে কিছু সময়

শরীর আর মন দুটো আলাদা নয়। একই সঙ্গে মিশে থাকে। একে অপরের উপর নির্ভরশীল। জীব জগতের প্রতিটি প্রাণী বিশ্রাম নিতে জানে। সারাদিনের পরিশ্রমের পরে পাখিরা বাসায় ফিরে। সিংহ শিকারের পর তিনদিন ঘুমায়। মানুষ একমাত্র মানুষ, এ ব্যাপারে পটু নয়। যার কারণে মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয় স্ট্রেস । স্ট্রেস থেকে শরীরে হরমোন ও রাসায়নিক তৈরি হয়। সেটা ধীরে ধীরে হৃদযন্ত্র, ধমনী্‌রক্ত চলাচলের নালীগুলোর উপরে ক্ষতিকর প্রভাব তৈরি করে। তাই বলা হয় বিশ্রাম অপরিহার্য। বিশ্রাম আলস্য নয়।

একটুখানি বিশ্রাম নেওয়ার তাগিদেই চলতি মার্চ মাসের প্রারম্ভে (তিন তারিখ) সেমি অফিসিয়াল সফরে চলে গেলাম- সেন্টমার্টিন । ইতোপূর্বে ২০০৫ সালে একবার ঢু মেরেছিলাম। আমি সাগর পাড়ের মানুষ, তাই বোধ হয় আমার মোটা চামড়ায় সেন্ট মার্টিন তেমন আবেদন সৃষ্টি করতে পারেনি। লঞ্চ, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা পূর্বেই নির্ধারিত । কক্সবাজারে গেলাম আগের দিন রাত্রে।

পরদিন সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা । কক্সবাজার থেকে গাড়িতে করে টেকনাফ। টেকনাফ এর দমদমিয়া জেটি থেকে জাহাজে করে সেন্টমার্টিন। আমরা প্রায় ২০/২২ জন। সকাল ৯ টার মধ্যেই টেকনাফ পৌছি। প্রায় তিন ঘণ্টা নদী ও সাগর পথে নিরবিচ্ছিন্ন পথ চলে পৌছে যায় বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে জেগে ওঠা একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে।

সেন্ট মার্টিন, যার আরেক নাম নারিকেল জিঞ্জিরা, দারুচিনি দ্বী্‌প, কোরাল আইল্যান্ড। কক্সবাজার থেকে টেকনাফের নাফ নদী দিয়ে সেন্টমার্টিনে যেতে হয়। ধারণা করা হয় যে চট্টগ্রাম জেলার তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার মি. মার্টিনের নাম থেকে সেন্টমার্টিন দ্বীপের নাম করণ করা হয়। ১৮৯০ সালে এ অঞ্চলে মানুষের বসবাস শুরু হয়। আরব বণিকরা বিশ্রাম নেওয়ার জন্য এই জায়গায় আগমন করত বলে জানা যায়। ১৯০০ সালে সেন্টমার্টিন নামকরণ করা হয়। এখানে ধান জন্মে এবং রয়েছে নারিকেল গাছের সমাহার। সাগরের পাড় জুড়ে কেয়া গাছ । অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত যাতায়াতের উপযুক্ত সময়। সেন্টমার্টিন থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে আর এক দ্বীপ- নাম ছেঁড়া দ্বীপ। রয়েছে প্রবাল। রয়েছে জীববৈচিত্র্যের জন্য অনুকূল পরিবেশ ।

আমাদের সফরসঙ্গীদের তালিকায় ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, কয়েকজন পরিচালক, উপপরিচালক, তাদের পত্নীগণ ও ছেলেমেয়ে । সব মিলিয়ে সংখ্যা একেবারে কম নয়। তিনটি স্থান নির্ধারণ করা হয়- থাকার জন্য। খাওয়ার আয়োজন ছিল এক জায়গায়। মেরিন পার্ক ,পরিবেশ অধিদপ্তরের নিজস্ব রেস্ট হাউস। ওখানে অবস্থান করেছিলেন মহাপরিচালক তার পত্নী সহ অন্যান্য মেহমান। আমরা কয়জন ছিলাম জেলা পরিষদের ডাকবাংলোতে। একজন পরিচালক সস্ত্রীক বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সেন্টমার্টিনের নামিদামি এক হোটেলে অবকাশ যাপন করলেন।

বিকেলে সেন্টমার্টিনের সৈকতের তীরে জেলা প্রশাসন, কক্সবাজারের নির্মিত অবকাশ কেন্দ্রে সীমিত আকারের সভায় যোগ দিতে হল। সভা পূর্বনির্ধারিত ছিলনা। ঘটনাচক্রে জনপ্রশাসন সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, চট্টগ্রাম সহ অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মতবিনিময় হলো। আলোচনার বিষয়- কিভাবে সেন্টমার্টিনকে জীববৈচিত্র সমৃদ্ধ করা যায়। পরিবেশ ও প্রতিবেশ কে সুরক্ষা দেওয়া যায়।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সেন্টমার্টিন দেখভাল করছেন। সেন্টমার্টিন নিয়ে অনেকগুলো সভা হয়েছে। সভায় ১৩/১৪ টি বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়েছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। সিদ্ধান্তগুলোর ২০ থেকে ৫০ শতাংশ বাস্তবায়িত হলে সেন্টমার্টিনের চিত্র পাল্টে যাবে বলে আমার ধারণা। মহাপরিচালক মহোদয়সহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তাদের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

সেন্টমার্টিন এর পরিবেশ ও প্রকৃতি নিয়ে অনেক লেখা যায় ।নদীর তীর অপূর্ব ,সাগরে বিচিত্র পাখির মেলা, মাছের আনাগোনা, মেঘ সূর্যের লুকোচুরি,পালতোলা নৌকা, স্পিড বুট এর আওয়াজ, মৃদু, সতেজ, শীতল হাওয়া, স্বচ্ছ নীলাবরণ, পর্যটকদের বাহারি পোশাকের সমাহার- এসব নিয়ে সেন্টমার্টিন অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ।

সেন্টমার্টিনে পা দেয়ার সাথে সাথেই চোখে পড়বে সারি সারি দোকান। অধিকাংশ হোটেল রেস্টুরেন্ট। রেস্টুরেন্টগুলোতে তরতাজা মাছের পসরা, বিশালাকৃতির ডালা সাজানো থরে থরে । দেখলেই মুখ দিয়ে লালা পরে। সারিবদ্ধ টমটম, ভ্যান, রিক্সা, এ দ্বীপের যাতায়াতের মাধ্যম। ভাড়া অনেক বেশি। জিনিসপত্রের দাম আকাশ ছোঁয়া। বছরে ব্যবসায় করে পাঁচ-ছয় মাস, তাই সারা বছরের আয় উপার্জনে ব্যবসায়ীরা ঝাপিয়ে পড়েন। রাস্তাগুলো জরাজীর্ণ। রোগী ও বয়স্কদের সাথে বড় বেমানান। বিদ্যুৎ নেই। সোলার সবখানে। মাঝে মাঝে জেনারেটর এর বিকট আওয়াজ দ্বীপের জীব বৈচিত্র্যের সাথে বেখাপ্পা লাগে। মোবাইল নেটওয়ার্ক খুবই দুর্বল। হাসপাতাল আছে। ডাক্তার নেই। মানুষের সংখ্যা সব মিলিয়ে ১০,০০০ হবে । জনপ্রতিনিধি আছে, কাজ দেখি না । অপরিকল্পিত, সবটাই অপরিকল্পিত। রাস্তাগুলো খানাখন্দে পরিপূর্ণ। যেখানে সেখানে ময়লা । খোলামেলা হোটেল। বিশাল বিশাল ভবন, নির্মিত, অর্ধনির্মিত। অনেকগুলো সংস্থার আছে রেস্ট হাউজ। আয় রোজগার ভালো।পর্যটক সংখ্যা বেশি, আয়তনের তুলনায় । সুযোগ-সুবিধা সীমিত।

মানুষ বিনোদন চায়, বিনোদনের আশায় ছুটে যায় সেন্টমার্টিন। অনেকে আশাহত হয়ে ফিরে। প্রবাল দ্বীপে প্রবাল এর দেখা মিলবে সীমিত আকারে । নারকেল জিঞ্জিরায় নারিকেল গাছ এত কম যে হাতে গোনা যাবে। হুমায়ুন আহমদ এর বিখ্যাত বাড়িটি চেনা দায়। রাতে সাগরের ফুসফাস শোনা যায়। আলোকায়ন নেই। জোসনা রজনীর সৌন্দর্যটা উপলব্ধি করা যায়নি। গ্রীষ্মের প্রচন্ড তাপদাহ এখনো শুরু হয়নি । মৃদু হাওয়ায় শরীর মন ছুঁয়ে যায়।

স্থানীয় জনগণের সাথে কথা বললাম। সবাই চায় ব্যবসা, পর্যটন, রাস্তা-ঘাট, হোটেল-মোটেল, জায়গা কেনা-বেচা, স্থাপনা নির্মাণ ইত্যাদি। এক ইঞ্চি জমি ও অবিক্রিত নেই। আমলা-কামলা সবাই এখানে জমিদার। ঢাকাইয়ারা সাবাড় করে দিয়েছে। সেন্টমার্টিনবাসী দেশান্তরিত হবে। সব কিছুতে বাগড়া দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। সবার চক্ষুশূল। টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করে সেন্টমার্টিনের উন্নয়ন-কখন, কীভাবে?-এসব হট কেক।

পরিবেশ অধিদপ্তর বসে নেই। সীমিত জনবল নিয়ে কাজ করছে। শৃঙ্খলা আনার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে । নির্মাণসামগ্রী, সিমেন্ট, বালি জব্দ করছে। মামলা, জরিমানা, ক্ষতিপূরণ ধার্য –এসব এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম চালাচ্ছে । চেয়ারম্যান বাহিনীর বিরুদ্ধে এখনো বুকে সাহস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রকল্প গ্রহণ করেছে ।সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। বাস্তবতা হলো -সুফল খুবই ক্ষীণ। মক্কা এখনো বহুদূর।

মুফিদুল আলম
পরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর (উপসচিব),
চট্টগ্রাম অঞ্চল।

আরও খবর

Stay Connected

0FansLike
3,320FollowersFollow
19,600SubscribersSubscribe
Adspot_img

সর্বশেষ সংবাদ